About BSPA

বাংলাদেশ ক্রীড়ালেখক সমিতি- ইতিকথা

দুলাল মাহমুদ : ১৯৫৪ সালে নির্মাণ করা হয় ঢাকা স্টেডিয়াম। এই স্টেডিয়ামকে কেন্দ্র করে জমজমাট হয়ে ওঠে ক্রীড়াঙ্গন। ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান-ভারত ক্রিকেট টেস্ট, পাকিস্তান-নিউজিল্যান্ড টেস্ট, ১৯৫৯ সালে পাকিস্তান-ওয়েস্ট ইন্ডিজ টেস্ট, পাকিস্তান-অস্ট্রেলিয়া টেস্ট, ১৯৬২ সালে পাকিস্তান-ইংল্যান্ড টেস্ট আয়োজিত হয়। ১৯৫৫ ও ১৯৬০ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় পাকিস্তান ন্যাশনাল গেমস। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের লাহোরে ও ১৯৫৮ সালে পেশোয়ারে ৮০ মিটার হার্ডলসে রেকর্ডসহ স্বর্ণপদক জয় করে কাঁপিয়ে দেন এ্যাথলেট লুত্ফুন্নেছা বকুল। ১৯৫৮ সালে শুরু হয় আগা খান গোল্ডকাপ ফুটবল। তাতে অংশ নিয়েছে দেশি-বিদেশি দল। এই টুর্নামেন্ট বেশ সাড়া জাগায়। একই বছর ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করে ক্রীড়াঙ্গনকে কাঁপিয়ে দেন সাঁতারু ব্রজেন দাস। এসব কিছু হয়েছে বিচ্ছিন্নভাবে। তবে প্রভাবিত করতে পেরেছে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের ক্রীড়াঙ্গনকে।

এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে থাকে ক্রীড়া লেখনী ও ক্রীড়া সাংবাদিকতা। ক্রীড়ালেখক ও ক্রীড়া সাংবাদিকরা সে সময় ভূমিকা রাখলেও তাঁদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ছিল না। তখন তো আর খুব বেশি পত্রপত্রিকা ছিল না। হাতেগোনা যে কটি পত্রিকা ছিল, তাতে খেলার কভারেজ খুব একটা দেওয়া হতো না। আলাদাভাবে ক্রীড়া রিপোর্টারের কথা ভাবাই যেত না। ইংরেজি দৈনিক পত্রিকায় এক-দুজন স্পোর্টস রিপোর্টার নিয়োগ দেওয়া হয়। কোনো কোনো পত্রিকায় ছিলেন খণ্ডকালীন রিপোর্টার। ফ্রিল্যান্সার ছিলেন কেউ কেউ। এমন একটা অবস্থায় একত্র হওয়ার তাগিদ অনুভব করেন ক্রীড়ালেখক ও ক্রীড়া সাংবাদিকরা। ১৯৬২ সালে গঠন করা হয় পূর্ব পাকিস্তান ক্রীড়ালেখক সমিতি, আজকে যা পরিচিত বাংলাদেশ ক্রীড়ালেখক সমিতি নামে। খ্যাতিমান ক্রীড়াবিদ ও ক্রীড়ালেখক আতিকুজ্জামান খানকে সভাপতি ও ক্রীড়া সাংবাদিক আবদুল মান্নান লাড়ু ভাইকে সাধারণ সম্পাদক করে গঠিত কমিটির সদস্যরা ছিলেন এবিএম মূসা, তওফিক আজিজ খান, আবদুল আউয়াল খান, আনিসুল মওলা, রেজাউল হক বাচ্চু, সৈয়দ জাফর আলী, মিজানুর রহমান, সৈয়দ এস এম ওজায়ের, হাফিজুল হজ দেশ নবী। প্রত্যেকেই কম-বেশি ক্রীড়া সাংবাদিকতা করতেন। সাংবাদিক ইউনিয়নের মতো রুটি-রুজি বা পেশাগত দাবি-দাওয়ার আন্দোলন করার জন্য এই সংগঠন গড়ে তোলা হয়নি। এ অঞ্চলের ক্রীড়াঙ্গনকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখাই ছিল তাঁদের প্রধান উদ্দেশ্য। সাংবাদিক ইউনিয়নের শক্তি যাতে দুর্বল এবং তাদের সঙ্গে কোনো বিষয় সাংঘর্ষিক না হয়, সেই বিবেচনা থেকেই নামকরণ করা হয় অপেশাদার এই সংগঠনের। মূলত নিজেদের একটি প্লাটফর্ম গড়ে তোলা ও তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের ক্রীড়াবিদদের তুলে ধরার ব্রত নিয়ে যাত্রা শুরু করে সংগঠনটি। সে সময় বাঙালি ক্রীড়াবিদদের উত্সাহ-উদ্দীপনা দেওয়ার বিষয়টি সর্বাগ্রে গুরুত্ব পায়। পাকিস্তানি সরকার ১৯৫৮ সালে প্রাইড অব পারফরম্যান্স, ১৯৬০ সালে তমাঘা-ই-ইমতিয়াজ প্রবর্তন করলেও তাতে বাঙালিদের গুরুত্ব দেওয়া হতো না। এর মধ্যে অবশ্য ফুটবলে অসাধারণ অবদান রাখার জন্য ১৯৬০ সালে সৈয়দ আবদুস সামাদ, ১৯৬৪ সালে খন্দকার নাসিম আহমেদ, ১৯৬৬ সালে সাহেব আলী এবং ১৯৬০ সালে সাঁতারে ব্রজেন দাস প্রাইড অব পারফরম্যান্স খেতাব পান। সামগ্রিকভাবে সেটা আশাব্যঞ্জক ছিল না। এ কারণেই ক্রীড়ালেখক সমিতি প্রতিবছর একজন সেরা ক্রীড়াবিদ নির্বাচনের বিষয়টি অগ্রাধিকার দেয়। ১৯৬৪ সালে ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের ফুটবলার জহুরুল হককে পুরস্কৃত করার মাধ্যমে শুরু হয় সমিতির নতুন পথচলা। সে সময়ের প্রেক্ষাপটে এটি ছিল একটি বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত। তখন বেসরকারিভাবে ক্রীড়াবিদদের পুরস্কার প্রদানের রেওয়াজ ছিল না। এক্ষেত্রে এই অঞ্চলে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা রাখে ক্রীড়ালেখক সমিতি। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৭ সালে পুরস্কৃত করা হয় পাকিস্তান জাতীয় হকি দলের প্রথম বাঙালি খেলোয়াড় বশীর আহমেদকে। তখন তো টগবগিয়ে ফুটছে পূর্ব বাংলা। বাঙালির স্বাধিকারের আন্দোলনের কারণে সংগঠনটি তার কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে পারেনি।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৫ জুলাই ক্রীড়া সাংবাদিক ও ক্রীড়া ধারাভাষ্যকার আবদুল হামিদের সভাপতিত্বে পূর্ব পাকিস্তান ক্রীড়ালেখক সমিতির নামকরণ করা হয় বাংলাদেশ ক্রীড়ালেখক সমিতি। একই বছর ৪ আগষ্ট আবদুল হামিদকে সভাপতি করে গঠন করা হয় নতুন কার্যনির্বাহী কমিটি। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে সমিতির নামে সরকারিভাবে বরাদ্দ করা হয় একটি কক্ষ । তবে বিভিন্ন সময়ে নানান জায়গায় স্থানান্তরিত হয়ে সমিতির কার্যালয় বর্তমান স্থানে থিতু হয়েছে। ১৯৭৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় সমিতির প্রথম বার্ষিক সাধারণ সভা। সমিতির বার্ষিক সাধারণ সভা গণতন্ত্রচর্চার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এতে সমিতির সদস্যরা খোলা মনে অকপটে বলতে পারেন। এটাও অন্যান্য ক্রীড়া সংগঠনের কাছে দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। ১৯৭৪ সালের ৪ মার্চ এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ১৯৭৩ সালের জন্য নির্বাচিত সেরা ক্রীড়াবিদদের আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কৃত করা হয়। সেরা ক্রীড়াবিদ নির্বাচন ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান আয়োজন থেকে সমিতি কখনো সরে যায়নি। সেই ধারা আজও অব্যাহত আছে। ২০০৪ সালে সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান চ্যানেল আইয়ের মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। সমিতির এই অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করেছেন দেশের খ্যাতিমান শিল্পীরা। বলা যায়, পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানটি সমিতির সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও বর্ণিল অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রপতি থেকে শুরু করে বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা এই অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকেন। এ অনুষ্ঠানের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকেন দেশের তাবৎ ক্রীড়াবিদও। সমিতির দৃষ্টান্তকে অনুসরণ করে প্রবর্তন করা হয় জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার। পরবর্তীকালে এগিয়ে এসেছে অন্যান্য সংগঠনও। ১৯৮৫ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় সাফ গেমসের বিভিন্ন ইভেন্টের সেরা ক্রীড়াবিদদের সাকুরা রেস্তুরাঁয় বেশ ঘটা করে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এ ছাড়া দেশ-বিদেশে আয়োজিত বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় সেরা ক্রীড়াবিদ নির্বাচন এবং বিশিষ্ট ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব ও ক্রীড়া সাংবাদিক, ক্রীড়ালেখককে সংবর্ধনা দিয়েছে সমিতি। দেশের জন্য যেসব ক্রীড়াবিদ ও ক্রীড়া দল সম্মান বয়ে এনেছে, তাঁদেরকেও সংবর্ধনা দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে বলা যায়, বাংলাদেশের ক্রিকেটকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে লন্ডনের সানডে টাইমস-এর ক্রীড়া সাংবাদিক রবিন মার্লারের। ১৯৭৭ সালে সফরকারী এমসিসি দলের সঙ্গে বাংলাদেশে এলে তাঁকে সংবর্ধনা দেয় সমিতি। তিনি বাংলাদেশ থেকে গিয়ে যে প্রতিবেদন লেখেন, তারই আলোকে বাংলাদেশের আইসিসির সহযোগী সদস্য হওয়ার পথ সুগম হয়। ১৯৭৭ সালে সমিতি প্রথমবারের মতো একটি স্মরণিকা প্রকাশ করে। তাতে ছিল বাংলাদেশের খেলাধুলার তথ্য ও রেকর্ড। এটিকে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের প্রথম দলিল হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। এই ধারাবাহিকতায় সমিতি তাদের স্মরণিকায় দেশে-বিদেশের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ক্রীড়ায় বাংলাদেশের প্রতিটি খেলার ফল প্রকাশ করেছে। সমিতির সদস্যদের উদ্যোগে বিভিন্ন সময় ক্রীড়াবিষয়ক পত্রপত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে। সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার লড়্গ্য নিয়ে বিভিন্ন সংগঠন ও দূতাবাসের সঙ্গে সমিতি প্রীতি ফুটবল ও ক্রিকেট ম্যাচ খেলেছে। ক্রীড়াসংস্কৃতির অংশ হিসেবে বিভিন্ন দূতাবাসের সৌজন্যে আয়োজন করা হয়েছে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী। দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করার ক্ষেত্রে এ ধরনের উদ্যোগ সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। সমিতির লেখকরা ক্রীড়াবিষয়ক বই প্রকাশ করলে তাদের প্রথম বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে এ ধরনের প্রকাশনা ও লেখককে উত্সাহিত করেছে সমিতি। ক্রীড়াঙ্গনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দিকনির্দেশনাও দিয়েছে সমিতি। দেশের ক্রীড়াঙ্গনে নির্বাচনের আয়োজনের প্রথম দৃষ্টান্তও তাদের। ক্রীড়াঙ্গনে গণতন্ত্রপ্রবর্তনের জন্য ১৯৯১ সালে আয়োজন করা হয় ক্রীড়াঙ্গনে গণতন্ত্র শীর্ষক এক সেমিনার। সমিতির কার্যক্রম দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে বিভিন্ন জেলায় গঠন করা হয় বিভিন্ন শাখা। এই শাখাগুলোও প্রশংসিত হয়েছে তাদের বিভিন্ন কর্মকান্ডের মাধ্যমে। ১৯৮৬ সালের ১৭ অক্টোবর হকি স্টেডিয়ামে উদ্বোধন করা হয় সমিতির গ্রন্থাগার। যদিও পরবর্তীকালে সেই গ্রন্থাগারটি রড়্গা করা সম্ভব হয়নি। প্রীতি ম্যাচ আয়োজন ও স্পনসরের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে ক্রীড়া কার্যক্রম চালানোর ক্ষেত্রেও সমিতির অগ্রণী ভূমিকা রয়েছে। পৃষ্ঠপোষকদের যথাযথভাবে মূল্যায়নও করেছে সমিতি। দুস্থ ক্রীড়া লেখক, ক্রীড়া সাংবাদিক ও ক্রীড়াবিদদের আর্থিকভাবে সাহায্য করতে সমিতি কখনো কার্পণ্য করেনি। খ্যাতিমান ক্রীড়াবিদ ও সমিতির সদস্যরা পরলোকগমন করলে তাঁদের স্মরণ করা হয় শোকসভার মাধ্যমে। আয়োজন করা হয়েছে ইফতার পার্টি, পুনর্মিলনী, ইনডোর ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, ফ্যামিলি ডে, বনভোজন, ঢাকার বাইরে বেড়ানোর মতো পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠান। বনভোজন আয়োজনটা হয় জমজমাটভাবে। সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক খন্দকার সালেক সুফীর কল্যাণে ১৯৮৯ সালে সিলেটের হরিপুরে একটি চমত্কার ট্যুর আয়োজন করা হয়। সমিতি ঘটা করে আয়োজন করেছে বাংলা নববর্ষও। এসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে সমিতির সদস্যদের মধ্যে গড়ে উঠেছে সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও নিবিড় বন্ধন। জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সমিতি সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে থাকে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ মিনারে পুস্পস্তবক অর্পণ করা হয়। নতুন ক্রীড়া লেখক সৃষ্টি ও ছাত্র-ছাত্রীদের খেলাধুলায় উদ্বুদ্ধ করার জন্য আয়োজন করা হয়েছে প্রবন্ধ প্রতিযোগিতার। ক্রীড়া ধারাভাষ্যকার গড়ে তোলার জন্য করা হয়েছে ক্রীড়া ধারাভাষ্য প্রশিক্ষণ কোর্স। প্রকাশ করা হচ্ছে সমিতির মুখপত্র প্রতিযোগী। আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে ক্রীড়া সাংবাদিক হিসেবে কভার করার ক্ষেত্রেও অনুসরণীয় হয়ে আছেন সমিতির সদস্যরা। বাংলাদেশ বিশ্বকাপের ফুটবলের চূড়ান্ত পর্বে কবে খেলতে পারবে, তার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। কিন্তু ১৯৯০ সালের ইতালির বিশ্বকাপ উপলক্ষে আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের খেলার স্বপ্ন দেখিয়েছে সমিতি। বিভিন্ন খেলার সমস্যা, সংকট নির্ধারণ ও উত্তরণের পথ বাতলে দেওয়ার জন্য আয়োজন করেছে নানা সেমিনার-সিম্পোজিয়াম-কর্মশালা। সমিতি পরিদর্শনে এসেছেন দেশ-বিদেশের বিশিষ্ট ক্রীড়া ব্যক্তিত্বরা। মহত্ ও মানবিক কাজেও পিছিয়ে নেই সমিতি। সমিতি আয়োজন করেছে স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি। তাতে সাড়া দেন ক্রীড়াঙ্গনের অনেকেই। স্বপ্ন দেখাতে কখনো পিছিয়ে থাকেনি ক্রীড়ালেখক সমিতি। যখন কেউ কল্পনা করতে পারেনি বিশ্বকাপে ক্রিকেটে বাংলাদেশ খেলবে, তখন সেই স্বপ্ন দেখিয়েছে সমিতি। ১৯৯২ সালে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে বিশ্বকাপ ক্রিকেট আয়োজনের পরপরই সমিতি আয়োজন করে বিশ্বকাপ ক্রিকেট ও আমরা শীর্ষক একটি আলোচনা সভা। আলোচনায় বক্তারা বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে আলোকপাত করে বলেন, সেদিন আর বেশি দূরে নয়, যেদিন বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলবে। কারণ, দলীয় খেলার মধ্যে একমাত্র ক্রিকেটে বিশ্ব পর্যায়ে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এই স্বপ্ন সত্য হতে খুব বেশি সময় লাগেনি। এমনিভাবেই ক্রীড়াঙ্গনকে এগিয়ে নিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে সমিতি। বিভিন্ন জেলা শাখায় সেমিনার আয়োজনেও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে সমিতি। প্রকাশনার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে থাকেনি। প্রকাশ করেছে বিভিন্ন গ্রন্থ। এই গ্রন্থগুলো সমৃদ্ধ করেছে দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে। ক্রীড়াঙ্গনে যোগাযোগ ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৯২ সালে সমিতি প্রকাশ করে টেলিফোন গাইড। বিষয়ভিত্তিক এ ধরনের গাইড সমিতির উদ্যোগেই প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৯৯৩ সালে বাংলা একাডেমীর বইমেলায় সমিতি প্রথমবারের মতো একটি স্টল নেয়। এই স্টলে কেবল ক্রীড়াবিষয়ক বইপত্র, ম্যাগাজিন, স্যুভেনির বিক্রি করা হয়। স্টলে প্রতিদিনই কোনো না কোনো তারকা ক্রীড়াবিদ উপস্থিত থাকতেন। তাঁদের উপস্থিতির ফলে সমিতির স্টলটি বইমেলায় দারুণভাবে সাড়া জাগায়।

সমিতির কর্মকান্ড শুধু দেশের পরিসরে সীমিত থাকেনি। পা বাড়িয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও। ১৯৯২ সালের ২৪ নভেম্বর এশিয়ান স্পোর্টস প্রেস ইউনিয়নের (আসপু) সদস্যপদ লাভ করে বাংলাদেশ। সিউলে আসপুর কংগ্রেসে সদস্যপদ লাভের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন সমিতির প্রতিনিধি কাজী আলম বাবু। পরবর্তীকালে আসপুর নির্বাহী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এ এস এম রকিবুল হাসান ও ইকরামউজ্জামান। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ১৯৯৩ সালে ৭ মে ইন্টারন্যাশনাল স্পোর্টস প্রেস অসোসিয়েশনের (এআইপিএস) সদস্য হয় বাংলাদেশ। তুরস্কের ইস্তাম্বুলে এআইপিএসের ৫৬তম এই কংগ্রেসে প্রতিনিধিত্ব করেন সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাহমুদ হোসেন খান দুলাল। খুলে যায় বাংলাদেশের ক্রীড়ালেখক ও ক্রীড়া সাংবাদিকদের বদ্ধ দুয়ার।

প্রতিবছর বিভিন্ন দেশে আয়োজন করা হয় এআইপিএস কংগ্রেস। এই কংগ্রেসে অংশ নেন সমিতির সদস্যরা। ক্রীড়ালেখক ও ক্রীড়া সাংবাদিকদের সর্বোচ্চ এই সংস্থায় যোগ দিয়ে পেশাগত ও সাংগঠনিকভাবে লাভবান হচ্ছেন তাঁরা। জানতে পারছেন ক্রীড়া সাংবাদিকতার সর্বশেষ হাল-হকিকত। সবচেয়ে বড় কথা, দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের ক্রীড়ালেখক ও ক্রীড়া সাংবাদিকদের সঙ্গে গড়ে উঠছে মৈত্রী ও সম্পর্কের বন্ধন। ১৯৯৩ সালের ১৯ ডিসেম্বরে সমিতির উদ্যোগে ঢাকায় গঠন করা হয় সাউথ এশিয়ান স্পোর্টস প্রেস কমিশন (সাসপক)। এতে যোগ দেন শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, নেপাল, মালদ্বীপ ও ভুটানের প্রতিনিধিরা। বিদেশি প্রতিনিধিদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাসহ যাবতীয় ব্যবস্থাপনায় ছিল সমিতি। আন্তর্জাতিক একটি সম্মেলন আয়োজন করে সমিতি দেখিয়ে দিয়েছে তার সাংগঠনিক সড়্গমতা। ক্রীড়াবিষয়ক স্টিকারও প্রকাশ করেছে সমিতি। ১৯৯৫ সালের ২ জুলাই প্রথমবার বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আয়োজন করা হয় বিশ্ব ক্রীড়া সাংবাদিক দিবস। এ উপলক্ষে সেবার ওয়াকথন, ক্রীড়াবিষয়ক প্রদর্শনী, দেশের ক্রীড়া সাংবাদিকতার দুই অগ্রদূত সৈয়দ জাফর আলী ও এবিএম মূসাকে সংবর্ধনা, ক্রীড়াবিষয়ক চিত্রাঙ্কন ও রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় শিশু-কিশোররা ক্রীড়াবিষয়ক যেসব ছবি এঁকেছে, তাতে ছিল বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে স্বপ্ন। পরবর্তী সময়ে সেই স্বপ্নের কোনো কোনোটি পূরণও হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এ দিনটি উপলক্ষে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ একটি বিশেষ খাম ও সিলমোহর প্রকাশ করে। এর পর থেকে প্রতিবছর দিনটি আড়ম্বরসহকারে উদযাপিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের (পিআইবি) সহযোগিতায় সমিতি আয়োজন করেছে ক্রীড়াবিষয়ক রিপোর্টিং কর্মশিবির। বিভিন্ন খেলার আইনকানুন ও কলাকৌশলের ওপর আয়োজন করা হয়েছে কর্মশালা। ক্রীড়াঙ্গনে প্রথমবারের মতো প্রবর্তন করে সরাসরি নামে জবাবদিহি অনুষ্ঠান। এ অনুষ্ঠানে এসেছেন ক্রীড়াঙ্গনের নীতিনির্ধারকরা। তরুণ লেখকদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য প্রতিষ্ঠা করে ফিচার ব্যাংক। বাংলাদেশ টেস্ট স্ট্যাটাস অর্জনের পর আয়োজন করা হয় টেস্ট উত্সব ও ক্রিকেট প্রদর্শনীর। প্রদর্শনীতে স্থান পায় অতীত ও বর্তমান ক্রীড়াঙ্গনের অনেক স্মারক। প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন শ্রীলঙ্কার তারকা ক্রিকেটার সনথ জয়াসুরিয়া, দীলিপ মেন্ডিস ও চামিন্ডা ভাস। এ প্রদর্শনী ক্রীড়া জাদুঘর প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখিয়েছে। যদিও সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি আজও। পূরণ না হলেও স্বপ্নটা তো আছে। সমিতির সদস্যদের কল্যাণে গড়ে তোলা হয়েছে কল্যাণ তহবিল। সমিতির কার্যক্রম দারুণভাবে প্রশংসিত হওয়ায় এআইপিএসের সদর দপ্তর থেকে ২০০০ সালে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে, To tell you the truth, you are one of the most productive Associations, sending us so many news about your activities. We thank you a lot. নানা রকম কার্যক্রম পরিচালনা করে ক্রীড়া উপযোগী পরিবেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সমিতির তত্পরতা মোটেও থেমে নেই।

সমিতি বরাবরই ক্রীড়া সাংবাদিকদের পেশাগত ও ক্রীড়ালেখকদের লেখালেখির ক্ষেত্রে এগিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কম্পিউটর যুগের একদম শুরুর দিকেই সমিতিতে কম্পিউটার সংযোজন করা হয়েছে। আর এখন তো ছোঁয়া লেখেছে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির। তারবিহীন নেটওয়ার্ক ওয়াই ফাই-এর মাধ্যমে সমিতির সদস্যরা সহজেই নিউজ পাঠাতে পারেন। ক্রীড়ালেখক ও ক্রীড়া সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সমিতি কখনো পিছিয়ে থাকেনি। লেখালেখি এবং পেশাগত কাজের বাইরে এক বুক তাজা হাওয়া নেওয়ার জন্য আড্ডার কোনো বিকল্প নেই। আর আড্ডার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে অবস্থিত বাংলাদেশ ক্রীড়ালেখক সমিতির কোনো জুড়ি নেই। জমজমাট এই আড্ডায় এক ঝাঁক তরুণ প্রাণের সঙ্গে যোগ দেন প্রবীণরা। ক্রীড়া সাংবাদিক বা ক্রীড়ালেখকদের পাশাপাশি এই আড্ডায় যোগ দেন খেলোয়াড়, সংগঠক ও ক্রীড়াসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশ ক্রীড়ালেখক সমিতির স্বপ্নের সারথি তরুণ প্রজন্মের ক্রীড়া সাংবাদিক ও ক্রীড়ালেখকরা। আশা করা যায়, এই স্বপ্নবানদের হাত ধরে অনেক দূর এগিয়ে যাবে আমাদের প্রিয় সংগঠন ও ভালোবাসার নিকেতন বাংলাদেশ ক্রীড়ালেখক সমিতি।

dulalmahmud@yahoo.com

লেখক- বাংলাদেশ ক্রীড়ালেখক সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

About BSPA

About BSPAaasas